This Bengali story is written by Sanjib Chakraborty for Bong Haat Blogs/Binodon
ভূতত্ত্ববিদ হিসেবে দেশের নানা প্রান্তে ঘুরে বেড়াই খনিজ দ্রব্যের তত্ত্বতালাশে। গতকাল সকালে এসে পড়েছি চরিবুরু গ্রামের মাইল তিনেক দুরের পাহাড়ি অঞ্চল পরিদর্শেনে। সাময়িক আস্তানা হয়েছে গ্রামের সীমানার বাইরে, জঙ্গলের ভিতর কোনো এক ক্ষীণতোয়া নদীর ধারে বিদ্যুৎ বিহীন পলস্তারা ঝরে পড়া বেশ পুরানো সরকারি বনবাংলোয়।
বনবাংলোর দক্ষিণে নদীর দিকে হরতকি কদম গাছের ছাড়া ছাড়া জঙ্গল। দু পাশে শাল সেগুনের ফাঁকে ফাঁকে ঘন পলাশ, কদম, বওড়া গাছের দল দৃষ্টি আটকে রেখেছে। সন্নিবদ্ধ গাছ গুলির নিচে ঘন হয়ে আছে এক ধরনের উঁচু ঘাস আর চীহড় লতার ঝোপঝাড়। বহু পুরনো গাছ গুলির ছড়ানো ডালা পালার চন্দ্রাতপের ঘেরাটোপে বাংলোর ঘাস হীন লাল মাটির আঙ্গিনা দিনের বেলাতেও ছায়াচ্ছন্ন। উপরে তাকালে উঁচু উঁচু গাছের ফাঁক দিয়ে দূষণ মুক্ত আকাশের নীল ফালি। বাংলোর সামনে একটি গাড়ি চলতে পারা লাল মাটির রাস্তা ঢেকে রেখেছে দুপাশ থেকে নুয়ে পড়া কোমর সমান বুনো ঘাসের ঝোপ। বাংলোর বাইরে পনেরো, কুড়ি পা দুরে ঝাঁকড়া আম গাছ। তার নিচে টালি ছাওয়া রান্না ঘরের চারপাশে ঘন রাংচিতার জঙ্গল। একপাশে বনবাংলোর চৌকিদার মংলুর ঘর।
স্থানীয় মানুষরা বলে এই জঙ্গলে নাকি হুড়ার, বন শুয়োর চরে বেড়ায়। নদীর ধারের জঙ্গলে পুরনো পিপুল গাছের নিচে আদিবাসীদের অপদেবতা গদ্রবোঙ্গার থান। ছোট ছোট পুতুল রাখা সেই থানে। মনে হয় কোন বিশেষ দিনে গ্রামের মানুষেরা পুজো দিতে আসে এখানে। স্থানীয় লোককাহিনী বলে অপদেবতা কুপিত হলে, সন্ধ্যের পর বাচ্চাদের রুপ ধরে পথচারী মানুষকে জঙ্গলের ভুলভুলাইয়ায় ঘুরিয়ে মারেন।
পাহাড়ি অঞ্চল পরিদর্শনে কেটে গেছে এই দু’দিন।
সন্ধ্যার পর সেদিন ফিরে এসেছি আমার অস্থায়ী আবাস এই বন বাংলোয়। দিনের আলোর ক্ষীণ রেশ কখন মিশে গেছে আকাশের ঘন অন্ধকারে। বাংলোর বারান্দায় বেতের চেয়ারে বসে আছি। ধীরে ধীরে নেমে আসা কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়ছে জঙ্গল। আজ বোধহয় অমাবস্যা। কানে আসে নিকটের নদীর মৃদু ছল্ ছল আওয়াজ। মাঝে মাঝে মাছের ঘাই মারার শব্দ। দুরে নদীর ওপারের কুয়াশার স্তরে ঢাকা নাম না জানা ছোট্ট গ্রামের কাঁপা কাঁপা বিন্দু বিন্দু আলোর মাদকতা। চেয়ারের পাশে রাখা লন্ঠনের আলোর চারিপাশে নানা রাতপোকার জমায়েত। রাতের মন্থর বাতাসে গাছের পাতা নড়ার ঝির ঝির, অশ্রান্ত ঝিঁঝির ঐকতান। আবেশে জড়িয়ে আসে চোখ। ঘন সন্নিবদ্ধ গাছের কালচে গুঁড়ি গুলোর গায়ে গায়ে কুয়াশার স্তর জড়িয়ে আছে। চরিবুরুর গ্রাম জঙ্গলে আঁধার নামে।
মংলু রাতে থাকে না। সে প্রথম দিনেই তার শর্ত শুনিয়েছিল, সন্ধ্যা নামার আগে তাকে ছেড়ে দিতে হবে। মংলুকে ফিরতে হয় প্রায় মাইল খানেক দুরের চরিবুরু গাঁয়ে। সেখানে তার এক সালের পুরনো জরু অপেক্ষায় থাকে। অন্ধকার নামার আগে তাকে সামনের গাড়ি চলার সরু রাস্তা পেরিয়ে ঘন শাল মহুয়ার জঙ্গলের মাঝ দিয়ে এঁকে বেঁকে চলে যাওয়া শুঁড়ি পথটা ধরে যেতে হয়। বলেছিলাম সন্ধ্যে নেমে গেলে সে আমার টর্চটা নিয়ে গাঁয়ে ফিরতে পারে। কেন জানিনা উত্তরটা সে এড়িয়ে গেছে। হয়ত কাছের অপদেবতা গদ্রবোঙ্গার থানই তার কারণ।
আজ দ্বিতীয় রাত। এক সপ্তাহের জন্য এসেছি তারপর আবার পরের পরিদর্শনে চলে যেতে হবে। কোলকাতায় থাকতে পারিনা, নতুন নতুন কাজের বরাত নিয়ে ফিরে আসি এই অঞ্চলে।
চরৈবেতি চরৈবেতি--
জড়তা কাটিয়ে মংলুর খোঁজ করি, কোনো সাড়া শব্দ নেই। কখন উধাও হলো জানিনা, হয়ত ঘুমিয়ে পড়েছি মনে করে আর ডাকে নি। মনে হয় পূর্ব শর্ত অনুযায়ী সন্ধ্যা নামার আগে গ্রামের পথে রওনা দিয়েছে। তার জরু অপেক্ষায় রয়েছে। জগতের কত মানুষ কত জনের প্রতীক্ষায় থাকে। পরিধি চিহ্নিত অগণ্য ভাসমান দ্বীপ উপদ্বীপ,তাদের নিজস্ব সার্বভৌমত্বে আবদ্ধ। তার বাইরের খবর কে কার রাখে!
রীনা হঠাৎ চলে গেল। পৃথিবী জঠরের জাগতিক খনিজ মণি রত্নের খোঁজে মগ্ন হয়ে মানবী হৃদয় অভ্যন্তরস্থ মণি রত্নের হদিস রাখিনি। প্রারম্ভিক যৌথ জীবনের সুরুতেই সে অসীম শূন্যতায় বিলীন হয়ে গেল যাওয়ার আগে কি বলেছিল---?
কোলকাতায় একা থাকতে থাকতে হাঁপিয়ে উঠেছিল রীনা। আমার সাথে প্রায় জোর করে চলে এসেছিল জনমনিষ্যি বিহীন বিহার ভূমির এক শুষ্ক পাহাড়িয়া অঞ্চলে। অস্থায়ী তাঁবু পড়েছিল পাহাড়তলি এক অনামা উচ্ছল নদীর ধারে। অতিশয় আনন্দে গুছিয়ে তুলেছিল তার অস্থায়ী তাঁবুর সংসার। সারা দিন পাহাড় জঙ্গলে কাটিয়ে তাঁবু তে ফিরে, লক্ষ কোটি তারায় মোড়া ঝকঝকে আকাশের নিচে, ডেক চেয়ারে বসে রীনার সারা দিনের জমে থাকা কথার ভিড়ে হারিয়ে যেতাম অজানা জগতে।
বুঝতে পারিনি রীনার শরীর মানিয়ে নিতে পারছিল না ওই অজ জায়গার আবহাওয়া। মুখ ফুটে কখনো প্রকাশ করেনি তার অসুবিধার কথা। এক গভীর রাতে আচমকা অস্বাভাবিক জ্বরে রীনা ঝিমিয়ে পড়েছিল বিছানায়। ওই দিন আমাকে নামিয়ে জিপটা কিছু যান্ত্রিক ত্রুটি সারাইয়ের জন্য চলে গেছিল প্রায় ত্রিশ কিলো মিটার দুরের শহরে, ফেরার কথা পরের দিন দুপুরে। শহর থেকে বহু দুরে জঙ্গল পাহাড় ময় জায়গায় কিছু করতে পারিনি সেদিন। চোখের সামনে রীনার অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকে। তারায় মোড়া আকাশের নিচে প্রবল জ্বরাচ্ছন্ন শরীরে, চলে যাওয়ার আগে জীবনের শেষ মুহূর্তে আমার অসহায় হাতে হাত রেখে অস্ফুট স্বরে বলেছিল “তোমার সাথে সাথে থাকব।” জ্বরাচ্ছন্নের বিকার?
কাজের শেষে এখনো ওই চারটি শব্দ মাথায় মনে ঝিম ধরায়, আজও নিজেকে ক্ষমা করতে পারি নি।
কি বলতে চেয়েছিল রীনা?
বারান্দার লন্ঠনের আলো নিস্তেজ হয়ে আসছে, তেল ফুরচ্ছে বোধহয়। নদীর জল ছুঁয়ে আসা ঠাণ্ডা বাতাসে অলস শরীর আর নড়তে চাইছে না। অর্ধ নির্মিলিত চোখ ঘুরে আসে জঙ্গলের গাছ গুলোর ঝাঁকড়া মাথায় জমে থাকা অন্ধকারে, সেখানে জোনাকির দল বিন্দু বিন্দু আলোর আঁকিবুকি কাটে।
লন্ঠনের নিভন্ত লালচে আলোয় হাতঘড়িতে দেখি প্রায় রাত সাড়ে দশটা। না: এবার উঠতেই হয়, রাত অনেক হল, হিমে ভেজা ঠান্ডাটা বাড়ছে একটু একটু করে। কিছুক্ষণ পরে চেয়ার ছেড়ে উঠতে গিয়ে,বারেকের জন্যে চোখ চলে যায় জঙ্গলের দিকে। গাছেদের কালচে গুঁড়ি পাক দিয়ে জমে ওঠা ধোঁয়াটে কুয়াশার স্তরে নদীর হালকা বাতাস ঢেউ ওঠায়। হঠাৎ মনে হল গাছের পাতার সিপ সিপ, ঝিঁঝিঁর ঐকতান যেন ক্রমশ কমের দিকে। ঝাঁক বাঁধা জোনাকিরা হঠাৎ আত্মগোপন করছে। লন্ঠনের নিভন্ত আলো দপদপিয়ে পুরোপুরি নিভে যাওয়ার সাথে সাথে আলোর চারপাশে ঘুরপাক খাওয়া রাতপোকাদের গুনগুনানিও গেল বন্ধ হয়ে। আচমকা এদের আনন্দ যজ্ঞে ভাঁটা পড়ল কেন? অনেকটা সময় অবাক হয়ে চেয়ে থাকি নিশুতি নিঝুম রাতের অন্ধকারে মোড়া জঙ্গলের অপ্রাকৃতিক পরিবেশে। রাতের আকাশের আবছা আলোয় এখন শুধুই কুয়াশার ঢেউ ওঠা নামা আর জমাট নিস্তব্ধতা। ঝিমানো ভাব চলে গিয়ে বিস্মিত দৃষ্টি এখন আবদ্ধ হয় কুয়াশার ঢেউয়ের অস্বাভাবিক ওঠা নামায়।
মংলু নিশ্চয়ই মোমবাতি রেখে গেছে ঘরে। টর্চ আছে পথ চলার সঙ্গী ঢাউস ব্যাগে,আমার চলমান সংসারের ভাঁড়ারে।
অন্ধকার বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি। ঘড়িটা দেখার চেষ্টা করে আন্দাজে মনে হল রাত প্রায় ১১টা। কখন এত রাত হয়ে গেল! বুঝতেই পারিনি। সাবধানে পা ফেলে আন্দাজে ঘরে এসে সময় নিলাম অন্ধকারে চোখ সইয়ে নিতে। দেখতে পাই ঘরের আধ খোলা জানালা দিয়ে রাতের নিজস্ব আবছা আলোর স্রোতে ভেসে এসেছে এক ঝলক ফিনফিনে স্তরীভুত কুয়াশা, অবাক হয়ে দেখি মেজে ও কড়ি কাঠের মাঝ উচ্চতায় ক্ষণে ক্ষণে সেই কুয়াশার আকৃতি গত পরিবর্তন।
কোথা থেকে নাম না জানা বুনো ফুলের মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসে ঘরের ভেতর। আশ্চর্য হই! বাইরের ঝোপঝাড়ে কোনো ফুল তো দেখিনি! ঘর ভরে উঠেছে ফুলের ঝিম ধরানো মিষ্টি গন্ধের মাদকতায়। হঠাৎ অনুভব করি অনেক দুরের থেকে ভেসে আসা ক্ষীণ স্বর –
“ঘরের বাঁ’দিকের দেওয়াল আলমারিতে রাখা ব্যাগে টর্চ আছে।”
ঠিক শুনতে পাওয়া নয়, এ যেন চেতন অবচেতনের মাঝের অনুভূতি, যেন স্বপ্নে শোনা কথা। কিন্তু স্বপ্ন তো হতে পারে না! এইতো আমি ঘরের ভিতর দাঁড়িয়ে আছি! ঘরের খোলা দরজার বাইরে গিয়ে চারপাশ দেখি, আধ খোলা জানলা দিয়ে উঁকি মারি। কেউ তো নেই! ভেতরে পাক খাওয়া কুয়াশার স্তর এখন ক্ষণে ক্ষণে জমাট বেঁধে আবার ছড়িয়ে পড়ছে ঘরের চারিপাশে - মাদকতাময় মিষ্টি গন্ধ মাখা কুয়াশা ঝিম ধরায়, যেন মাতাল হয়ে যাই। টর্চ জ্বালি, আলোর ফোয়ারায় ঘরের চারিদিকে ঝলমলানি। লাগোয়া বাথরুমে উঁকি মারি, সেখানে বালতি ভরা জল রাখা কিন্তু কেউ তো নেই! কিছুক্ষণ আগে শোনা শব্দ গুলো এখনো মস্তিষ্কের কোষে কোষে পাক খায়। মনের ভুলই হবে, গা হাত পা ধুয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরালাম। আশ্চর্য লাগে, ঘরের বাইরের বারান্দায় ফুলের মিষ্টি গন্ধটা তো নেই - কিছুক্ষণ পরে,সেই দূর থেকে ভেসে আসা ক্ষীণ স্বর মস্তিষ্কের কোষে কোষে আবার অনুভূত হয়-
“কি হলো? খাবে না? পাশের ঘরে টেবিলে খাবার ঢাকা আছে, মোমবাতিও রাখা আছে।”
জ্বলন্ত সিগারেট খসে পড়ে। সারা শরীরে বয়ে যায় শিরশিরে আলোড়ন। স্খলিত পায়ে পাশের ঘরে গিয়ে দেখি মংলু টেবিলে খাবার চাপা দিয়ে রেখেছে,দুটো মোমবাতিও টেবিলের উপরে রাখা। মোমবাতির নরম আলোয় বসে মনের ভেতর ভাবনা ঘুরপাক খায়। ওই কথা গুলির কোনো জাগতিক শব্দ তো পাই নি,কিন্তু কি ভাবে যেন কিছু শোনার অনুভূতি আমায় পরিচালিত করছে!
রাত প্রায় ১টা। বিছানার ধারে স্বপ্নাচ্ছন্ন হয়ে বসে আছি। মোমের নরম আলোয়, ফুলের গন্ধে আমোদিত ঢেউ ওঠা ফিনফিনে কুয়াশাছন্ন ঘর। চিন্তার ক্ষমতা হারিয়ে গেছে। পাগল হয়ে যাচ্ছি না তো! জাগ্রত অবস্থায় অবচেতন মন দ্বারা পরিচালিত হচ্ছি নাকি? আবার মস্তিষ্কের ভিতর কথা শোনার উপলব্ধির আলোড়ন-
“শুয়ে পড়ো,কাল আবার সকাল সকাল বেরোতে হবে তো!”
আবার চমক লাগে, শব্দ নেই কিন্তু এই নির্দিষ্ট কথা গুলি তো খুবই চেনা, যেগুলো শোনার অনুভূতি এখনো আমাকে নাড়া দিচ্ছে! স্তব্ধ হয়ে বসে থাকি। এতো রীনার কথা! শোয়ার দেরি হলে রীনা তাড়া দিত এই ভাবে!
ছাদের কড়ি কাঠের দিকে তাকিয়ে শুয়ে আছি। ঘরে হাওয়া নেই, খাটের পাশের ছোট টেবিলে মোমবাতির শিখা স্থির, ঘরের ভিতর কুয়াশার স্তর, নাম না জানা ফুলের মিষ্টি গন্ধের সাথে মিশে নানা আকৃতি ধরে পাক খায় নিজের খেয়ালে , মস্তিষ্কে অনুচ্চারিত কথায় রীনার কাছে জিজ্ঞাসা আলোড়িত হয় –
“তুমি বলেছিলে - ‘তোমার সাথে সাথে থাকবে।”
রাত বেড়ে চলে - মন কারুর সান্নিধ্যের আভাসে আচ্ছন্ন, অদ্ভুত শান্তিতে সমাহিত জড় শরীর নড়াচড়ায় অপারগ। ঘরের ভিতরে কুয়াশার আকৃতি গত পরিবর্তন লক্ষ্য করি। বেশ কিছুক্ষণ পর দেখি কুয়াশা স্তর , কুন্ডলাকৃত আকার নিয়ে জানালা দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে নদীর স্রোতের মত। মিষ্টি গন্ধটাও আবছা হতে হতে ক্রমশ যেন মিলিয়ে যায়, শুয়ে থাকি অনেকক্ষণ। কোথাও রাত জাগা পাখি ডেকে ওঠে।
শরীরের জড়তা কাটিয়ে ঘরের দরজা খুলে বারান্দায় আসি - রাত শেষ হতে দেরি নেই। কুয়াশা স্রোত ঘরের জানালার বাইরে ভাসতে ভাসতে গাছেদের চারপাশে জমাট বেঁধে স্থির হয়ে আছে, ঝিঁঝির মৃদু ঐকতান, নদীর হালকা বাতাসে গাছের পাতার সিপ্ সিপ্ শব্দ ধীরে ধীরে ফিরে আসছে।
গাছেদের ধারে ধারে ক্রমশ ফিকে হয়ে যাওয়া কুয়াশার স্তর, বারান্দায় চেয়ারে বসে চেয়ে থাকি, মনে হল রীনার উপস্থিতির সাক্ষী হয়ে রইলো দূর পূব আকাশে জ্বল জ্বল করা শুকতারা। জঙ্গলের একটা দুটো ঘুম ভাঙা পাখির ডাক ভেসে আসে। বড় বড় গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে ভোরের নরম আলোর পরশ ক্রমশ সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। শেষ কুয়াশার রেশ মিলেমিশে যায় ভোরের আলোয়। সাথে হারিয়ে গেল রীনার সান্নিধ্যের ছোঁয়া।
রীনা তার কথা রেখে গেল.....
“ সাব, চা ” – হুঁশ ফেরে কারুর কণ্ঠ স্বরে। ভোরের আলো পিছলে যাওয়া সবুজের থেকে দৃষ্টি ফেরে স্বরের উৎসে। অবাক চোখে, চায়ের কেটলি ও কাপ হাতে বান্দার নিচে দাঁড়িয়ে আছে মংলু। তার জিজ্ঞাসু দৃষ্টির সামনে অপ্রস্তুত বোধ করি। চা’এর কাপ রাখতে বলে,তাড়াতাড়ি ঘরের দিকে ফিরি। ঘরের ভেতর পা রাখার আগে আর একবার ফিরে তাকাই কাছের গাছ গুলোর দিকে, যেখানে রীনা ছিল কুয়াশার সাথে মিশে।
বোধ হয় রেখে গেল তার “সাথে সাথে থাকার” অঙ্গীকার।

